
সবং 3 রা ফেব্রুয়ারী:
এ যেন একই সঙ্গে দু’টি পরীক্ষা। একদিকে বাড়িতে পড়ে রয়েছে বাবার মৃতদেহ। অন্যদিকে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা মাধ্যমিক। অবশেষে স্কুলের শিক্ষক এবং আত্মীয়দের পরামর্শে কান্নাভাজে চোখে বাবার মৃতদেহ বাড়িতে রেখেই জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষায় বসল সবংয়ের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মধুমিতা কর। শোকাহত অবস্থায় পরীক্ষা দিয়েও জানাল, ‘বাবার দেহ ছেড়ে আসতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তবু সবাই বোঝানোয় পরীক্ষাকেন্দ্রে আসি। পরীক্ষা ভাল হয়েছে। পরের পরীক্ষাগুলিও দেব।’

একদিকে জীবনের বড় পরীক্ষা আর অন্যদিকে জীবনের বড় খুঁটি চলে যাওয়া,এই দুটোর মাঝে পড়েই লড়াই মধুমিতার।তবে এখানে এসে থেমে থাকে নি।অবশেষে কান্না ভেজা চোখেই পরীক্ষা দিয়ে জানালো প্রথম পরীক্ষা ভালো হয়েছে এবং সে বসল দ্বিতীয় পরীক্ষায়।ঘটনা ক্রমে জানা যায় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং ব্লকের সারতা গ্রামের বাসিন্দা মধুমিতা কর।এই বছর সে বসলো তার জীবনের প্রথম পরীক্ষা মাধ্যমিকে।মূলত সারতা তারকনাথ ইন্সটিটিউশনের ছাত্রী সে। ২০২৬ এর মাধ্যমিক পরীক্ষার তার সেন্টার ছিল দশগ্রাম সতীশচন্দ্র সর্বার্থসাধক শিক্ষাসদনে।সারতা থেকে যা প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে।পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিও নিয়েছিল ভালোই। সোমবার ছিল মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রথম দিন। তাই রবিবার রাত পর্যন্ত পড়েছিল। ফের ভোর থেকে উঠেই পড়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ ঘুম ভাঙে বাড়ির লোকের কান্নার আওয়াজে। ধড়ফড় করে উঠে দেখেন বাবা বাদলচন্দ্র করকে ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বাড়ির সকলে।

পরে স্থানীয় চিকিৎসককে ডাকা হলে তিনি বাদলচন্দ্র করকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। বই ছেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মেয়েও। মধুমিতার বাবার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। খবর পান স্কুলের শিক্ষকরাও।একদিকে বাড়িতে লোক ভর্তি আর অন্যদিকে পরীক্ষা শুরু বারোটা থেকে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের পাশাপাশি পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনেরাও সকলে মধুমিতাকে বোঝান। অন্যদিকে তখন বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে মধুমিতার দিদি ও জামাইয়েরাও বাড়িতে হয়। যদিও কান্না ভেজা চোখেই পরীক্ষা কেন্দ্রে যায় মধুমিতা এবং মানসিক বিপর্যস্ত মধুমিতা পরীক্ষা ভালো হয়েছে বলে জানায়। এই ঘটনায় মধুমিতার বাড়িতে যান সারতা তারকানাথ ইন্সটিটিউশনের শিক্ষক অজয় বর্মণও। অজয় বলেন, ‘বাবার মৃত্যুতে মেয়ের মনের অবস্থা কী হয় আমরাও জানি। তা জেনেই ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম। বোঝালাম, পরীক্ষায় না বসলে একটি বছর নষ্ট হবে।

তাই মনের কষ্ট চেপে যেন পরীক্ষায় বসে। মেয়েটি পড়াশোনায় খারাপ নয়। প্রথম বিভাগে পাশ করার যোগত্য রয়েছে বলেই মনে করি। গ্রামীণ এলাকায় থেকেও এতদিন পড়াশোনা করে পরীক্ষায় না বসলে ক্ষতি হতে পারে ভেবেই বোঝায়। তাতে অবশ্য মধুমিতা পরীক্ষায় বসতে রাজি হয়।’অন্যদিকে জামাইবাবু অনুপ আদক বলেন, ‘সকলে বোঝাতে মধুমিতা পরীক্ষা দিতে রাজি হয়। আমিই মধুমিতাকে মোটরবাইকে করে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যায়। মধুমিতাকে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢোকানোর পর শ্বশুরমশাইকে দাহ করা হয়।’ অনুপ জানান, ‘শ্বশুরমশাইয়ের বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। হাই সুগার ও কিডনির রোগ ছিল। কিছুদিন আগে পায়ে চোটও পেয়েছিলেন। তা নিয়ে ভুগছিলেন। তা থেকে বাড়িতেই মৃত্যু হয়।’মধুমিতার বাবার মৃত্যুর খবর পৌঁছয় তার পরীক্ষাকেন্দ্র দশগ্রাম সতীশচন্দ্র সর্বার্থসাধক শিক্ষাসদনেও।

এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক যুগল প্রধান বলেন, ‘আমাদের স্কুলে না পড়লেও যেহেতু এখানে পরীক্ষা দিচ্ছে তাই মধুমিতাও আমাদের ছাত্রীর মতোই। সে জন্য পরীক্ষা শুরুর আগে আমাদের শিক্ষিকারা ওর কাছে গিয়ে ভাল করে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে অনুপ্রেরণা জোগায়। যাতে শোকাহত অবস্থা থেকে সে পরীক্ষা দেওয়ার মানসিক জোর পায়।’ সব মিলিয়ে পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বেরোনোর সময় মধুমিতাকে দেখা গেল আত্মবিশ্বাসী। দু’চোখে শোকের ছাপ থাকলেও পরীক্ষা যে ভাল হয়েছে তা বোঝা যায়। যদিও পরীক্ষা ভালোই হয়েছে বলে দাবি তার।এদিন জীবনে দ্বিতীয় পরীক্ষা ইংলিশে বসল সে। পাশাপাশি সে দাবি করে পরের পরীক্ষাগুলিও এমন ভাল দিতে চাই।