
ঝাড়গ্রাম 12 ই আগস্ট:
মঙ্গলবার ১২ ই আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস।যদিও জঙ্গলমহলের জ্বলন্ত সমস্যা হাতি! প্রতিনিয়ত সকাল হলেই গ্রামে গ্রামে শোনা যাচ্ছে হাতির হানায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি,ঘরবাড়ি ভাঙচুরের বা প্রাণহানির কথা।কখনো ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে মাটির বাড়ি। তারপরেও হাসিমুখে জঙ্গলমহলের ছাপোষা মানুষরা বলে উঠলো, ‘ভালো থাক ওরা। ওরা তো আমাদের ঠাকুর’। তাদের কথায়,হাতিরা অবুঝ ,নির্বোধ আর তাদের বাসস্থান হারিয়ে ঠিকানার সন্ধানে এপ্রান্ত থেকে সে প্রান্ত ছুটে বেড়াচ্ছে।ফলস্বরূপ ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে মানুষজনকে।

মূলত মঙ্গলবার ছিল বিশ্ব হাতি দিবস।আর এই হাতি দিবসে শত ক্ষয়ক্ষতি সত্বেও তাদের মঙ্গল কামনা জঙ্গলমহলের বাসিন্দাদের।মূলত ঝাড়গ্রাম জেলায় ঝাড়গ্রাম,খড়গপুর,মেদিনীপুর এবং রূপনারায়ন এই চারটি বন বিভাগ রয়েছে। চারটি বনবিভাগে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ টি হাতি ঘুরপাক খায়।হাতি এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে যাওয়ার পথে ফসলের পাশাপাশি রাস্তায় পড়ে যাওয়া গ্রামে খাবারের সন্ধানে হানা দিয়ে তছনছ করে দিচ্ছে।সন্ধ্যার পর জঙ্গল পথে বাড়ি ফেরার পথে হাতির হানায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।গবাদি পশু চরাতে গিয়ে হাতির আক্রমণে পড়তে হচ্ছে গ্রামবাসীদের।শনিবার ঝাড়গ্রামের বিন্দাবনপুরে জঙ্গল থেকে গরু আনতে গিয়ে এক যুবক।তাঁর উরুতে দাঁত ঢুকিয়ে দিয়েছিল একটি হাতি।কোনক্রমে প্রাণে বাঁচে সে।এই ধরনের ঘটনা হামেশাই লেগে রয়েছে। এরই সঙ্গে হাতি দিনের বেলায় জঙ্গলে থাকলেও রাত হলে খাবারের সন্ধানে হানা দিচ্ছে ফসলের খেতে কখন আবার গ্রামে।

সম্প্রতি জারুলিয়া গ্রামে ঢুকে একটি হাতির দল আটটি বাড়ি ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিল। লালগড়ের সাঁওতাল ধানশোলায় জানলা ভেঙে খাবারের সন্ধানে হাতি শুঁড় ঢুকিয়ে দিলে বাঁশের বাড়ি দিয়ে প্রাণে বেঁচে ছিল বৃদ্ধ দম্পতি।স্কুল,আইসিডিএস কেন্দ্র হানা দিয়ে মিড ডে মিল চাল খেয়ে সাবাড় করে দিচ্ছে হাতি, পাশাপাশি ভেঙ্গে ফেলছে স্কুলের জানালা দরজা।হাতির ক্রমবর্ধমান উপদ্রবের কারণে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন ঘটেছে জঙ্গল লাগুয়া গ্রামের মানুষগুলির।বিঘার পর বিঘা জমিতে সবজি,ধান চাষ বন্ধ করে কাজুবাগান করে দিচ্ছে অনেকেই।কারো আবার জমি পতিত পড়ে থাকছে।স্কুলের গণ্ডি পার হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার জন্য হাতির ভয়ে বাইরে যেতে পারছে না পড়ুয়ারা।কারণ সন্ধ্যার পর জঙ্গল পথে বাড়ি ফেরার সময় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে হাতি।সাঁকরাইল ও নয়াগ্রাম ব্লকে ব্যাপক পরিমাণে আখের চাষ হতো যা বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষিজীবী মানুষজন হাতির তাড়নায় চাষ ছেড়ে দিনমজুরি করতে ঝাড়গ্রাম ও খড়্গপুর শহরে চলে যাচ্ছে।

প্রতিনিয়ত এত ক্ষতির পরেও জঙ্গল লাগুয়া গ্রামের মানুষজন হাতির ভালোটাই চাইছেন। সাঁকরাইলের আঙ্গারনালী গ্রামের বাসিন্দা সুশীল মাহাতো বলেন,’পূর্বাপুরুষ থেকে হাতিকে আমরা ঠাকুর বলে আসছি। একটা সময় জঙ্গলে হাতি ও মানুষের সহবাস স্থান ছিল। গ্রামীণ পূজার সময় দেবদেবীকে মাটির হাতি , ঘোড়া নিবেদন করা হয়। হাতিরা অবুঝ তারা তো ক্ষতি করবেই। বনদপ্তরের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত যেন হাতি ও মানুষ উভয় সুস্থ স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারে’।প্রসঙ্গত,হাতির সমস্যা সমাধানে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বনদপ্তরের দফায় দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।জঙ্গলে হাতিকে আটকে রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলের গাছ আম, কাঁঠাল, বেল, চালতা রোপণ করছে বনদপ্তর।জঙ্গলের মধ্যে তৈরি করা হচ্ছে বড় বড় জলাশয়।ঝাড়গ্রাম বন বিভাগের গিধনি রেঞ্জের ঝাড়খন্ড বর্ডার লাগবো এলাকায় ১৫ টি পুকুর খনন করেছে বনদপ্তর।

বনাঞ্চল বৃদ্ধির জন্য জঙ্গল সহ চারিদিকে রোপন করেছে প্রচুর পরিমাণে ফলের গাছ।জঙ্গল লাগুয়া গ্রাম এবং স্কুল গুলিকে হাতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সোলার পাওয়ার ফেন্সিং বসানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।ঝাড়গ্রাম বন বিভাগের এক একাধিকারিক বলেন,’হাতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং আগামী দিনে আরো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।হাতির প্রতি মুহূর্তের গতিবিধির উপর নজর রাখা হয়’।