
মেদিনীপুর 16 ই জানুয়ারি:
জঙ্গলমহল মানেই উদ্ভিদের সমাহার। কত রকমারি উদ্ভিদ যে রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ফলে এখনও আবিষ্কার হয়ে চলেছে নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ। কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই সমস্ত উদ্ভিদের তথ্য মিলবে কোথায়? সেই লক্ষ্যে এবার জীববৈচিত্র ও তার বংশগতি সংরক্ষণে উদ্যোগী হল বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। যার পোশাকী নাম দেওয়া হয়েছে ‘বায়োডাইভার্সিটি এণ্ড জার্মপ্লাজম কনজারবেশন সেন্টার’।

মূলত ইতিমধ্যেই তার কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। কাজটি করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা ও বনবিদ্যা বিভাগ। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দীপক কুমার কর বলেন, ‘আমাদের চারপাশে থাকা জীব বৈচিত্র ও তার বংশগতি লিপিবদ্ধ রাখতেই এই উদ্যোগ। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সহজেই নির্দিষ্ট জায়গায় সমস্ত তথ্য পেতে পারেন।‘বায়োডাইভার্সিটি এণ্ড জার্মপ্লাজম কনজারবেশন সেন্টার’ এ কী থাকবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা ও বনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অমলকুমার মন্ডল জানান, এটি একটি বৃহৎ কর্মকান্ড। তার মধ্যে যেমন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকা ৯০টি ভেষজ গাছ-সহ ১৪০০ গাছের যাবতীয় তথ্য ডিজিটাইটেশন করা। সেই কাজটি অবশ্য শেষ হয়ে গিয়েছে। তেমনই ডিজিটাল হার্বেরিয়াম তৈরি। যেখানে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়া এই পাঁচটি জেলায় থাকা সমস্ত গাছের তথ্যও ডিজিটাল পদ্ধতিতে রাখা হবে।

যেমন চরক সংহিতা নামে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি ভেষজ উদ্যান তৈরি হয়েছে তেমনই বিপন্ন ও লুপ্তপ্রায় ৪০টি গাছ চিহ্নিত করে সেই গাছের একটি বাগান তৈরি করা হবে। সিএসআইআরের সাহায্যে এই বাগানও হবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তৈরি করা হবে একটি বায়ো ডাইভার্সিটি পার্কও।এছাড়াও রাখা হবে ‘অ্যামাজিং প্লান্ট’। যেমন জায়ান্ট লিলি, কৃষ্ণবট, শাখাযুক্ত চালগাছ, নীলপদ্ম প্রভৃতি। এর মধ্যে অবশ্য ইতিমধ্যেই কৃষ্ণবট ও শাখাযুক্ত তালগাছ লাগানো হয়েছে। জায়ান্ট লিলি লাগানোর জন্য তৈরি করা হচ্ছে পরিকাঠামো। যে পদ্মপাতায় মানুষও বসে থাকতে পারে।তা ডুববে না। বিশ্বের নানা জায়গায় থাকা এমনই বিস্ময় গাছেরও স্থান হবে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। তারই সঙ্গে ভেষজ উদ্ভিদের ডিএনএ পরীক্ষা করে জিন ব্যাঙ্কও তৈরি করা হবে। সর্পগন্ধা, নিম, তুলসী, গাঁদালের মতো প্রায় ৩০টি ভেষজ গাছের জিন ব্যাঙ্ক ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে।

বাকি ক্ষেত্রে কাজ তলছে বলে জানিয়েছেন অমলকুমার মন্ডল। পাশাপাশি রাখা হবে সদ্য নতুন আবিষ্কৃত দু’টি উদ্ভিদও (সোলেনোস্টোমা বিদ্যাসাগরেনসিস এবং ফসমব্রিনিয়া বেঙ্গলালিনসিস)। এখানেই শেষ নয়, থাকবে বায়োডাইভার্সিটি মিউজিয়ামও। যেখানে গাছের বীজ, গাছের বিভিন্ন অংশ, ফল, পাতা প্রভৃতি সংরক্ষণ করা থাকবে। প্রাকৃতিক ভাবে রং উৎপাদন করা যায় এমন গাছেরও (পলাশ, মেহেদি) বাগান তৈরি করা হবে। প্রাকৃতিকভাবে তন্তু বেরোনে বাবুই ঘাষ থেকে মাদুর কাঠির গাছ – এমনই নানা কিছুতে সমৃদ্ধ থাকবে এই কেন্দ্র। কাজটি সম্পূর্ণ হলে জেলা বা রাজ্যের পড়ুয়া, গবেষক বা অধ্যাপকদের তো বটেই, বিদেশের উৎসাহী গবেষকরাও উপকৃত হবেন বলেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিমত। অধ্যাপক অমলকুমার মন্ডল বলেন, ‘এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞে নামতে পেরেছি উপাচার্যের পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে বলেই।

কাজটি সম্পন্ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনই পড়ুয়া ও গবেষকরাও ভীষণভাবে উপকৃত হবেন। কারণ, আমাদের এই জঙ্গলমহলকে কেন্দ্র করে এমন কাজ কোথাও নথিবদ্ধ নেই, যা থেকে সহজে একজন সব তথ্য পেতে পারেন। আমাদের কাজটি সম্পূর্ণ হলে ওয়েবসাইটেও তা দেওয়া থাকবে। ফলে বিশ্বের যে কোনও প্রান্ত থেকে মানুষ এক ক্লিকেই যাবতীয় তথ্য পেয়ে যাবেন।’