
মেদিনীপুর 15 ই সেপ্টেম্বর :
একদিকে টানা বৃষ্টি সেইসঙ্গে বিপর্যস্ত জেলার বিভিন্ন বিধানসভা। অন্যদিকে মানুষের সঙ্গে বাড়িতে, শুকনো জায়গায় ঠাঁয় নিয়েছে বিষধর সাপেরা। চলতি বছরে ১৪০০ সাপে কাটা রোগী জেলায়, যা নিয়ে চিন্তার ভাঁজ স্বাস্থ্য আধিকারিকদের মধ্যে। যদি ওই ঘটনায় মৃত্যু ২২ জনের। তবে আধিকারিকের দাবি,গোল্ডেন পিরিয়ডে হাসপাতালে না গিয়ে ঝাড়ফুঁক করানোর জন্যই মৃত্যু ঘটছে,আরও সচেতন হতে হবে নাগরিকদের। তবে কেন বারে বারে মৃত্যু ঘটছে সাপে কাটা রোগীদের তা নিয়ে মাঠে ময়দানে নেমে ক্ষতি দেখলে ইটিভি ভারত।

মেদিনীপুর কে বলে জঙ্গলমহল অধ্যুষিত! কারণ মেদিনীপুরের একটা অংশ রয়েছে বিস্তৃত জঙ্গল,সেই সঙ্গে রয়েছে এলাকার মানুষের কাঁচা পাকা বাড়ি এবং আগেকার দিনের মাটির বাড়ি সেই সঙ্গে হোগলা পাতার বাড়ি। পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল, দাসপুর,কেশপুর গড়বেতা শালবনী অন্যদিকে নারায়ণগড়, কেশিয়াড়ি পিংলা বা সবং এর বেশিরভাগ মানুষেরই এই বর্ষাকালে প্লাবিত হয়ে পড়ে। সরকারি ত্রান শিবির খোলা হয় আর সেই ত্রাণ শিবির এই কয়েকদিন তারা আশ্রয় নেন সরকারি সাহায্যে। এলাকা জলে ডুবে থাকায় মানুষের পাশাপাশি সেই শুকনো বাড়িঘরে বা ত্রান শিবিরে আশ্রয় নেয় বিষধর সাপেরা। পশ্চিম মেদিনীপুর জুড়ে এই সাপের উপদ্রব যেন দিন দিন বেড়েই চলছে। একদিকে একটানা সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে এই সাপে কাটার ফলে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। প্রতিদিন মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ খড়্গপুর হসপিটাল, ঘাটাল কিম্বা ছোট বড় শালবনী নারায়ণগড় পিংলা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা। কেউ জমিতে ফসল তুলতে গিয়ে, কেউ আবার বাড়িতেই সাপের দংশন হচ্ছেন। অনেকে আবার সেই সাপ উদ্ধার করতে গিয়েও সাপের দংশন খাচ্ছেন হাতে-পায়ে।

যার ফলে সংখ্যা বেড়েই চলছে দিন দিন।যদিও সঠিক সময়ে এই সাপে কাটা রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে এসে এভিএস দেবার ফলে তারা সুস্থ হচ্ছেন, বাড়ি ফিরছেন কিন্তু এই বছর সাপে দংশিত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা সেই সংখ্যাটা ছাড়িয়েছে ১৭ প্লাস। অন্যদিকে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৪০০ জন। গতবছরের তুলনায় যা কম কিন্তু সংখ্যা হিসেবে বেশি। তবে কেন এই বিষধর সাপের কাটার ফলে মানুষের মৃত্যু ঘটছে তা খতিয়ে ঘুরে দেখল ইটিভি ভারত। আর তা খতিয়ে দেখতে গিয়ে দেখা গেল একবিংশ শতাব্দীতেও ওঝা গুনিনের ঝাড়ফুঁক এবং গুনিনের কারসাজির জন্যই আজও সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কারণ হিসেবেই এই সর্প বিশারদ বা স্বাস্থ্য আধিকারিকরা জানাচ্ছেন যে, মেদিনীপুর জুড়ে যে চার থেকে পাঁচটা বিষধর সাপ রয়েছে বিশেষ করে কেউটে,গোখরো,কাল চিতি এবং বড়া সাপ তাদের বিষের প্রভাব সঠিক সময় হাসপাতাল নিয়ে এলেই তারা সুস্থ হয়ে যান কিন্তু এই সাপে কাটার ফলই সাধারণ মানুষ তারা হাসপাতালের পরিবর্তে আজও ওঝা গুনিনের কাছে দৌড়ে যাচ্ছেন। আর সেখানে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ঝাঁড়ফুক, তুকতাক করে সময় কাটিয়ে ফেলেছেন সেই ‘গোল্ডেন পিরিয়ড’ যেই সময়টা বিষ নামানোর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা ছিল হাসপাতালের।

এরপর যখন রোগীর অবস্থা বেহাল হয়ে পড়ছে ঘন্টা পাঁচ ছয় পর সেই রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসছেন শেষ পরিস্থিতিতে। আর তখন চিকিৎসকরা কিছুই করে উঠতে পারছেন না সেই রোগীর জন্য। ফলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে এই সাপে কাটা রোগীরা। যদিও এখনও এই একবিংশ শতাব্দীতেও এই তুকতাক ঝাড়ফুঁকের উপরও ভরসা রাখছেন বেশ কিছু মানুষ। কেন না খোদ শহরেরই এক সাপে কাটা পরিবারের দাবি, তাদের পরিবারের লোককে যখন সাপে কেটেছিল তখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে যদি ওঝা গুনিনের কাছে নিয়ে যাওয়া হতো তিনি বেঁচে যেতেন কিন্তু তাকে ওঝা গুণীনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়নি। যার জন্যই মারা গেলেন। পাশাপাশি পরিবার এও অভিযোগ তুলছেন যে তাদের কোন শত্রু শত্রুতার বশে এই ‘সাপ চেলে’ দেওয়ার ফলেই তাদের পরিবারের লোক মারা যায়। ফলে এখনো পর্যন্ত কুসংস্কার এই সাধারণ মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি জেলা প্রশাসন বা স্বাস্থ্য আধিকারিকেরা। তাই অনেক সর্পবিশারদ বা সাধারণ মানুষ চাইছেন এদিকে নজর দিক প্রশাসন ও স্বাস্থ্যের অধিকর্তারা। সেইসঙ্গে বিজ্ঞান মঞ্চ দাবি তুলেছে এই নিয়ে বারে বারে কর্মশালা হোক, সচেতন করা হোক এবং মানুষের কে কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানানো হোক।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,মেদিনীপুর সদরের অন্তর্গত ধেড়ুয়ার বাসিন্দা তপন কুমার কুমার সিংহ(৫৪) যিনি সর্প বন্ধু নামে পরিচিত প্রতি তিনি মারা যান এই সাপে কাটার ফলে। কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় সাপে কাটার পর তিনি বাড়িতেই বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে দেন ওঝা গুনীনের ভরসায়। এই ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে বলা যায়, মেদিনীপুর সদরের অন্তর্গত কুকুরমুড়ি এলাকায় একটি বিষধর সাপ উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি যখন সাতটি উদ্ধার করে প্লাস্টিকের ডাব্বার মধ্যে ভরছিলেন সেই সময় তার অসাবধানতায় সাপটি ঘুরে গিয়ে তাকে ছোবল মারে। যদিও এরপর তিনি সাপটিকে উদ্ধার করে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তার মৃত্যু হয়।যা নিয়ে এলাকায় শুরু হয় চাঞ্চল্য। কেননা এর আগে এই সর্প বন্ধু হিসেবে পরিচিত তপন কুমার জানা এক ও একাধিক বিষধর সাপ উদ্ধার করেছে। পাশাপাশি তিনি যখন সাপ টি উদ্ধার করেছিলেন তখন তিনি এই বার্তায় দিয়েছিলেন,’ যে কেউ যেন তার মতন এভাবে সাপ না ধরে।’ যদিও পরিবার সূত্রে খবর, তাকে সাপ কাটার পরও তিনি হাসপাতালে যেতে দেরি করেন। ঘন্টা দুই তিনের পর তিনি হাসপাতালে গিয়ে ট্রিটমেন্ট করতে গিয়ে তখন মারা যান।’যেই ঘটনায় গোটা জেলা জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। যদিও তার মৃত্যুর কারণ হিসেবেই তার বাড়িতে ঘন্টার পর ঘন্টা রয়ে যাওয়া এবং ওঝা গুনিনের উপর ভরসা করায় কাল হয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ তোলেন।

এই বিষয়ে এলাকার সর্পবন্ধু দেবরাজ চক্রবর্তী বলেন,” প্রথমে প্রশাসনকে বলবো যে সকল গ্রামেগঞ্জে ওঝা গুনিন আছে তাদেরকে সতর্ক,সচেতন করতে। কারণ কোন সাপে কাটা রোগী তাদের কাছে গেলে তারা যেন সরাসরি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। নচেৎ তারা দু তিন ঘন্টা দেরি করার ফলে সেই রোগী হাসপাতালে পরবর্তীকালে নিয়ে গেলে মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি তিনি বলেন আগেকার মানুষ শিক্ষা পায়নি, তাই তারা সচেতন নয় কিন্তু এখনকার মানুষ অনেক সচেতন এবং আমরা অনেক করে সচেতন করছি। এটা আরো সময় হয়তো লাগবে।”
অন্যদিকে সাপে কামড় খেয়ে মারা যাওয়া রঞ্জন ঘোষের পরিবারের দাবি,”বছর ১০ এর আগে আমার স্বামী রঞ্জন ঘোষকে সাপে কামড়ে ছিল। উনি সাপ ধরে সাপ ছেড়ে দিতেন,ঘরে সাপ পুষতেন,তাদের স্নান করাতেন খাওয়াতেন। কিন্তু কোন কারনে তাকে কামড়ে দেয়। তারপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে মারা যায়। কিন্তু আমাদের বক্তব্য হলো যে ওনাকে যদি হাসপাতালে না গিয়ে আমাদের ঘরের ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হতো, হয়তো সারিয়ে ফেলত। তবে সেটা সময় অনেক পেরিয়ে গেছে, এখন বর্তমান যুগ এখন সবাইকে বলব হাসপাতালে যেতে এবং হাসপাতালের কাছে আবেদন করব তারা যেন খুব দ্রুত চিকিৎসা করে। কারণ দ্রুত চিকিৎসা না করার জন্য প্রচুর রোগী মারা যায়।”

তবে এ বিষয়ে স্থানীয় গ্রামীণ চিকিৎসক হারাধন দুয়ারির বক্তব্য,’আমাদের কাছে বহু পেশেন্ট আসে এই সাপে কাটা। আমরা তাদেরকে সরাসরি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু বহু মানুষ এখনো আছে যারা এখনো ওঝা গুনিনের কাছে দৌড়ে যায়। আর তাতেই তাদের গোল্ডেন পিরিয়ড নষ্ট হয়। ফলে যখন রোগীটি একদম শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন তারা হাল ছেড়ে দেয় এবং রোগী হাসপাতালে নিয়ে আসে। আর তাতেই দুর্ঘটনা ঘটে। এই কালচার এখনো শেষ হয়নি। তাই অবিলম্বে সবাই কেই বার্তা দেবো,যাতে সাপে কামড়ালেই আগে হাসপাতালে দৌড়ে আসে এবং নির্দিষ্ট এভিএস নেয় হাসপাতাল থেকে।” তার বার্তা,’কোন ওঝা গুনিন নয় চিকিৎসা একমাত্র হাসপাতালই পাওয়া যায়।’
অন্যদিকে জেলার জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণ বলেন,”আমাদের কাছে পর্যাপ্ত AVS আছে কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো মানুষ সাপে কাটলে তাকে নিয়ে যেতে দেরি করে ফেলে। আরো সচেতনতা দরকার আছে বিশেষ করে বন্যা প্লাবিত এলাকায়। যেখানে যোগাযোগ মাধ্যম কম। কয়েকটা এরিয়া আমরা চিহ্নিত করেছি, স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে সচেতনতা ক্যাম্প করা হবে। পাশাপাশি তিনি বলেন যে ওঝা এবং ঝাড়ফুকের জন্য সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে সেইসব ওঝা গুনিনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে খুব তাড়াতাড়ি।”

তবে বিজ্ঞান মঞ্চ দাবি করে,’পূর্বতন সরকার আমাদের যে আন্টিভেনাম সিরাম তৈরি করার প্রোডাকশন হাউস ছিল তা বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন সরকারের কাছে আবেদন করবো সেই প্রোডাকশন হাউস টি চালু করা। কারণ অন্যান্য রাজ্যে তাদের প্রোডাকশন হাউস থাকার জন্য তাদের সিরাম প্রয়োগ করে ১০০% মৃত্যু ঠেকানো গেছে কিন্তু আমাদের রাজ্যে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে এবং মৃত্যু ঘটছে। এটা পুরোপুরি হিউম্যান রিসোর্স লস। তাই সাধারণ মানুষকে যেমন বলবো তারা ওঝা গুনিন এর কাছে না গিয়ে হাসপাতালে এসে ট্রিটমেন্ট করুক,সেই সঙ্গে সরকারের কাছে আবেদন করব তারা যেন এই প্রোডাকশন হাউসটি চালু করার ব্যবস্থা করে। তাতেই মৃত্যু ঠেকানো যাবে এই রাজ্যের সাপে কাটা রোগীদের।’

অন্যদিকে স্বাস্থ্য আধিকারিক এর মত অনুযায়ী,”এ বছর সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যদিও প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হয়েছে তার প্রধান কারণ। তবে গত বছরের তুলনায় এখনো কম আছে কিন্তু সংখ্যাটা অনেক বেড়ে গেছে। আমরা বারে বারে ওই জন্য কোন তান্ত্রিক বা গুণিনের কাছে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।”
এখন প্রশ্ন উঠছে কবে খুলবে এভিএস প্রোডাকশন হাউস এবং কবেই বা সিরাম উৎপাদন হবে সেই সঙ্গে দেওয়া হবে রাজ্যবাসীকে। যদিও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তিনি এই বিষয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেও জানিয়েছেন এই হাউসটি খোলার। এখন দেখার কবে এন্টিভেনাম তৈরি হয় রাজ্যে।