Midnapore Statue : স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন দেওয়া বিপ্লবী স্ট্যাচু মূর্তি গুলির ছাল চামড়া উঠে বেহাল! কোনটার আবার নাক-কান ঝরে কাক পক্ষীর মলমূত্রে বিদ্ধ, দায় দায়িত্ব কার প্রশ্ন আমজনতার

Share

মেদিনীপুর 16 ই সেপ্টেম্বর :

“বল বীর, বল উন্নত মম শির।” ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তৎকালীন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার শির প্রতিটি মুহূর্তে হিমাদ্রির মতো শিখরে অবস্থান করত। বর্তমানের ঝাড়গ্রাম, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা মিলে ছিল তখনকার মেদিনীপুর জেলা। সেই জেলার কত যুবক যে দেশ স্বাধীন করার ব্রত নিয়ে অত্যাচারী ব্রিটিশ বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই। তাঁরা বাস্তবেই নিজেদের বিদ্রোহী মানসিকতায় যেন মহাকাশ ফেড়ে দিয়েছিলেন। দেশের মাটিতে তেরঙা ঝান্ডা তোলার স্বপ্নে সেই জেলার ছেলেদের কীর্তি বিশ্ব ইতিহাসে এখনও সোনার অক্ষরে লেখা রয়েছে।

এই দামাল ছেলেদের অনেকের নামই হয়তো আজকের স্বাধীন ভারতের আমবাঙালির জানা নেই। তবে নাম জানা না থাকলেও তাঁদের কীর্তি অমরত্ব পেয়েছে৷এই দামালদের দাপটে একটা সময় সেনা পরিবৃত্ত ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটদের অনেকেই মেদিনীপুর জেলার দায়িত্ব নিতে ভয় পেতেন৷ সবসময় শঙ্কায় থাকতেন, কখন কী হয়৷ ক্ষুদিরাম বসু, মৃগেন দত্ত, বিমল দাশগুপ্ত, রাজনারায়ণ বসু, অনাথবন্ধু পাঁজা, নির্মল ঘোষ, ব্রজকিশোর চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ রায়, নির্মলজীবন ঘোষ, কামাক্ষ্যা ঘোষ, নন্দদুলাল সিংহ, সুকুমার সেন, শশাঙ্ক দাশগুপ্ত, পরিমল রায়, ফণীন্দ্রনাথ কুণ্ডু, শান্তিগোপাল সেন সহ আরও কত যুবক যে দেশকে স্বাধীন করার ব্রত নিয়ে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই। শুধুই কি যুবকরা? এই জেলার মহিলারাও দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের সঁপে দিয়েছিলেন দেশমাতৃকার সেবায়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মাতঙ্গিনী হাজরা থেকে শুরু করে সুখদাময়ী রায়চৌধুরী, সত্যভমা জানা, সিন্ধুবালা মাইতি, গীতা ভৌমিক, শৈলবালা দাস, বিন্দুবালা দাস, কুমুদিনী ডাকুয়া, চারুশীলা জানা, প্রভাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়, কাননবালা পট্টনায়েক, ননীবালা মাইতি সহ আরও কতজন।

এঁরা প্রত্যেকেই দীর্ঘ সময় দিন কাটিয়েছেন বাংলার ‘বাস্তিল’ দুর্গে (মেদিনীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারকে এই নাম দিয়েছিলেন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা)। মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অত্যাচারী ব্রিটিশদের ধর্ষণেরও শিকার হয়েছেন।স্বাধীনতা সংগ্রামে এই জেলার মহিলাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণে চিন্তায় পড়ে যায় ব্রিটিশ শাসকরাও। তাই তাদের নির্দেশেই মহিলারা ধর্ষণ, এমনকি গণধর্ষণেরও শিকার হন। স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করতে মেদিনীরপুর জেরায় ব্রিটিশ শাসকের অত্যাচার স্তম্ভিত করেছিল মহাত্মা গান্ধিকেও। তিনি জওহরলাল নেহরুকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন, এই অত্যাচার জালিয়ানওয়ালাবাগের থেকেও ভয়ঙ্কর৷ অনেকদিন আগে থেকেই জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা স্মরণে রাখতে, তাঁদের আত্মত্যাগের কাহিনি মানুষকে জানাতে মেদিনীপুর জেলার আনাচে কানাচে বসানো হয়েছে বিপ্লবীদের মূর্তি। শুধু শাসক কিংবা বিরোধীরা নয়, অনেক ক্ষেত্রে জেলার মানুষজন নিজেরা উদ্যোগ নিয়েও রাস্তাঘাটে একাধিক বিপ্লবীর মূর্তি স্থাপন করেছেন।

কিছু ক্লাব, সংঘ এবং সমিতিও এমন অনেক মূর্তি বসিয়েছে অনেক রাস্তা ও মহল্লার নাম বিপ্লবীদের নামে রাখা হয়েছে৷ সেসব রাস্তা ও মহল্লায় সংশ্লিষ্ট বিপ্লবীদের মূর্তি স্থাপিত হয়েছে৷ বিশেষ করে ক্ষুদিরামের মূর্তির স্মরণে ক্ষুদিরাম নগর, মাতঙ্গিনী স্মরণে মাতঙ্গিনী সরণী, বিদ্যাসাগর স্মরণে বিদ্যাসাগর রোড, মঙ্গল পাণ্ডের নামে মঙ্গল পাণ্ডে সরণী, লাল বাহাদুরের স্মরণে লালবাহাদুর শাস্ত্রী চক, মহাত্মা গান্ধি স্ট্যাচু স্মরণে গান্ধী স্ট্যাচু রোড ইত্যাদি। মূর্তি হয়ে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, ভগৎ সিংরাও৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এসব মূর্তি কেবলমাত্র স্থাপন করাই হয়েছে, কিন্তু শুধুমাত্র বিশেষ দিন ছাড়া কখনও এই মূর্তিগুলি পরিষ্কার করা হয় না৷ মূর্তি পরিষ্কারের কোনও দায়িত্বও নেয় না মেদিনীপুর পৌর প্রশাসন অথবা কোনও সংগঠন। জন্ম কিংবা মৃত্যু, এই দুটি দিন ছাড়া বাকি সময় অবহেলা অনাদরে কাক-পক্ষীর মল এবং পচা-নোংরা ফুলের মালায় আবদ্ধ থাকে মূর্তিগুলি। ছাল চামড়া ওঠা রবীন্দ্রনাথের মূর্তি যেমন দৃষ্টিকটু, তেমনই ভগ্ন, কান খাওয়া বা ক্ষতবিক্ষত মূর্তির ছবি এখন মেদিনীপুর জেলাজুড়ে। যার জেরে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে আমজনতার মধ্যে। সকলেই চাইছেন, এসব মূর্তির সংরক্ষণ এবং সেগুলির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিক পৌর কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষজনও।

এই বিষয়ে স্থানীয় সুরজিৎ চৌধুরী বলেন ,”মেদিনীপুর বিপ্লবীদের আঁতুড় ঘর, সেখানে বিপ্লবীদের মূর্তি,স্ট্যাচু বসানো হয়েছে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। কিন্তু দিনের পর দিন প্রশাসনের অবহেলায় সেগুলো আজ অনাদরে পড়ে রয়েছে। যেখানে তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে শহরবাসীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্য ছিল সেখানে তারা পড়ে রয়েছে কাক পক্ষীর মলমূত্রে। তাছাড়া নতুন সরকার আসার পর থেকেই এই বিপ্লবীদের নিয়ে বিশেষ বিশেষ কর্মসূচি পালন করছে অথচ বিপ্লবীদের স্ট্যাচু আজ পড়ে রয়েছে আবর্জনা অবস্থায়। তাই এটা প্রশাসনকে অবিলম্বে দেখতে হবে, পদক্ষেপ নিতে হবে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।”

স্থানীয় শিক্ষক সোমনাথ মহাপাত্র বলেন,”বিপ্লবী শহর মেদিনীপুরে এই মূর্তি, স্ট্যাচু বসানো হয়েছিল শহর বাসি ও জেলা বাসির শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কিন্তু অবাক করার বিষয়, স্পেশাল দিন ছাড়া বাকি সময় সেগুলো নোংরা আবর্জনায় পরিপূর্ণ হয়ে থাকে এর দায়িত্ব নিতে হবে অবিলম্বে প্রশাসনকে। অবিলম্বে তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে শহরবাসীর জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। যাতে সব দিন তাদের শ্রদ্ধা জানানো যায় এই মেদিনীপুরে।’

যদিও এই বিষয়ে মেদিনীপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান সৌমেন খাঁ বলেন,”মেদিনীপুর শহরের বহু মূর্তি স্ট্যাচু ভেঙে গিয়েছিল সেগুলো আমরা সারিয়ে দিয়ে নতুন বসানোর চেষ্টা করেছি। অনেকগুলো বসিয়েছি, অনেকগুলো বসানোর বাকি আছে। এরই পাশাপাশি যেগুলো রং উঠে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে সেগুলোও পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি। তবে পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এটা বলবো, শুধু প্রশাসন পৌরসভায় পরিষ্কার করবে, রং করবে তা নয়- সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, সবাইকেই পরিষ্কার করতে হবে। কারণ এই মূর্তি, স্ট্যাচুর পাশ ঘিরে দোকান গজিয়ে উঠছে, মানুষ তার ব্যবসা করবে, ব্যানার দিয়ে ঘিরে ফেলবে তাও ঠিক নয়। কারণ সবাই যদি এগিয়ে এসে সাহায্য করে পরিষ্কার করা উদ্যোগ নেয় তবে এই বিপ্লবী শহরের মেদিনীপুরের মর্যাদা ফিরে পাবে।”

এই বিষয়ে ইতিহাসের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অপর্ণিতা ভট্টাচার্য বলেন,’এ বিপ্লবী শহর মেদিনীপুরে মূর্তি স্ট্যাচু
গুলো বসানো হয়েছিল কেবলমাত্র শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর জন্য। প্রশাসনের যেমন দায়িত্ব আছে সেগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার সেই সঙ্গে আশেপাশে যে স্কুল কলেজগুলো রয়েছে তাদেরও উচিত এগুলোকে যথা সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার। তবে স্কুলের থেকে কলেজের বিভিন্ন কেন্দ্র সরকারের প্রকল্প রয়েছে এনএসএস ইউনিট রয়েছে, তারাও এগিয়ে এসে এই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নিতে পারে। এতে সচেতনতা বৃদ্ধি হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে সঙ্গে ভালো প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়। পাশাপাশি তিনি বলেন এই মূর্তি স্ট্যাচুর আশে পাশের বাড়ি গুলো তারাও দায়িত্ব নিতে পারে এই মূর্তি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নর।”

এখন দেখার কবে ফিরবে হুঁশ প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের, কবে পরিষ্কার হবে এই মূর্তি ও স্ট্যাচু গুলির।


Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *