
চন্দ্রকোণা 28 সে সেপ্টেম্বর :
চারিদিকে শুধু জল আর জল আর সেই জলমগ্ন পরিস্থিতিতে আটকা পড়ে যায় এক প্রসূত মহিলা। তবে তাকে উদ্ধার করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় পুলিশকে। ওসির তৎপরতায় স্পিডবোট নামিয়েও উদ্ধার করা যায়নি। পরে এমনি নৌকা চালিয়ে তাকে উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এলাকার মানুষের কুর্নিশ।

জলবন্দি গ্রাম সেখানে রয়েছে এক প্রসূতি মহিলা।গ্রামের সাথে সমস্তরকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।প্রসূতির ডেলিভারি হতে হাতে দশদিন সময় এমনই জানিয়েছেন চিকিৎসক।এরমাঝে প্রসূতি যদি কোনো শারীরিক অসুবিধা বোধ করে?জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা পেতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে বন্যা।তাই স্বাস্থ্য দপ্তরের থেকে খবর পেয়ে জলবন্দি গ্রাম থেকে প্রসূতিকে উদ্ধার করে নিরাপদ কোথাও পাঠানোর উদোগ নেয় পুলিশ।শুরু হয় প্রসূতিকে উদ্ধারের তোড়জোড়।জোগাড় করা হয় একটি স্পিডবোট।তাতে থানার ওসি সমেত কয়েকজন পুলিশ কর্মী ও স্পিডবোট চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন কর্মী।তাঁরাই প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে প্রসূতির বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দেয় জলবন্দি গ্রাম থেকে প্রসূতি উদ্ধারে।জলে ডোবা মাঠ,কোথাও ছাতি সমান জল আবার কোথাও জলের মধ্যে ধান গাছ বেরিয়ে রয়েছে।জলে ভেসে আসা পানা এড়িয়ে ইঞ্জিনের মাধ্যমে প্রায় দুই কিলোমিটার স্পিডবোট এগিয়ে চলে।কিন্তু বাকি দুই কিলোমিটার পথ এগিয়ে যেতে কাঠখড় পোহাতে হয় স্পিডবোটের কর্মী থেকে পুলিশকে।কারণ জলে ভেসে থাকা ধান জমিতে স্পিডবোটের ইঞ্জিন চালানো দুষ্কর।অগত্যা বাঁশ দিয়ে স্পিডবোট বেয়ে নিয়ে যাওয়া হয় প্রসূতির বাড়ি অবধি।এই দুই কিলোমিটার স্পিডবোটকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অন্যদের সাথে বাঁশ নিয়ে বোট ঠেলে নিয়ে যেতে হাত লাগালেন খোদ থানার ওসি।বিকেল গাড়িয়ে ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে প্রসূতি বাড়ি পৌঁছাতে।বাড়ি থেকে প্রসূতি সমেত তাঁর পরিবারের কয়েকজনকে সাথে নিয়ে বোটে চাপিয়ে ফের দুই কিলোমিটার বোট ঠেলে গভীর জল অবধি নিয়ে যাওয়া হয়।সেখান থেকে বোটের ইঞ্জিন চালিয়ে পৌঁছনো হয় গ্রাম থেকে দূরে পিচ রাস্তায়।সেখানে পুলিশের গাড়িতে করে প্রসূতিকে নিরাপদে তাঁর বাপের বাড়িতে পাঠানো হয়।

শনিবার বিকেল থেকে রাত জলবন্দি দুর্গম এলাকা থেকে প্রসূতি মহিলাকে উদ্ধার করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় চন্দ্রকোণা থানার পুলিশকে।তবে পুলিশের এহেন ভূমিকায় খুশি প্রসূতির পরিবার। মূলত শিলাবতী ও কেঠিয়া নদীর জলে চারিদিক থেকে জলবন্দি চন্দ্রকোণার মানিককুন্ডু গ্রাম।বাঁকা সুলতানপুর থেকে মানিককুন্ডু যাওয়ার রাস্তায় ছাতি সমান জল।ডুবে গিয়েছে মাঠঘাট।এরই মাঝে চন্দ্রকোণা-১ ব্লক স্বাস্থ্য দপ্তরের কাছে খবর যায় মানিককুন্ডু গ্রামে চম্পা পাল মন্ডল নামের এক প্রসূতি মহিলা রয়েছেন।তাঁর ডেলিভারি হতে হাতে আর বেশিদিন নেই।চিকিৎসক জানিয়েছেন অক্টোবরের ৬ তারিখ তাঁর সম্ভাব্য ডেলিভারির ডেট।শনিবার দুপুরে বাঁকা সুলতানপুরে পৌঁছয় চন্দ্রকোণা-১ ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রবীর হাজরা সহ স্বাস্থ্য দপ্তরের একটি টিম।কিন্তু যাওয়ার রাস্তা বন্ধ থাকায় তাদের ফিরে যেতে হয়।ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক জানিয়েছেন,আমাদের কাছে খবর আসার পরই প্রসূতির গ্রামে পৌঁছনোর জন্য যায়।

কিন্তু যাওয়া সম্ভব হয়নি।পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয় যাতে ওই প্রসূতিকে গ্রাম থেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করে তাঁরা।চন্দ্রকোণা থানার ওসি প্রত্যয় দাস একটি স্পিডবোট জোগাড় করে বাঁকা সুলতানপুরে পৌঁছন।সেখান থেকে মানিককুন্ডু গ্রামে প্রসূতি চম্পা পাল মন্ডলের বাড়ি গিয়ে তাঁর বাবা-মা ও শ্বশুরকে সাথে নিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে ক্ষীরপাইয়ে বাপের বাড়িতে পাঠানো হয়।আপাতত সেখানেই থাকবে চম্পা। জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা পেতে আর কোনো সমস্যা হবে না তাঁর।জানা গিয়েছে,প্রসূতি চম্পা প্রথম মা হবে।বন্যার জেরে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে আপাতত তাঁকে বাপের বাড়িতে থেকেই নিজের গর্ভে থাকা সন্তানের খেয়াল রাখতে হবে।জলবন্দি শ্বশুর বাড়ি থেকে মেয়েকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যেতে পেরে দুঃশ্চিন্তা কেটেছে চম্পার মা-বাবার।হঠাৎ করে কোনো সমস্যা হলে আর বৌমার চিকিৎসা নিয়ে চিন্তায় পড়তে হবেনা শ্বশুর বাড়ির সদস্যদেরও।

এই বিষয়ে এলাকার ক্ষীরপাই BMOH প্রবীর কুমার হাজরা বলেন,’ জলমগ্ন এলাকা আমরা খবর পেয়েছি এক প্রসূতি মা আটকা পড়েছে এই জলমগ্ন এলাকায়।
আমরা চেষ্টা করছি এই প্রসূতি মহিলাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবার। পুলিশ প্রশাসন তৎপরতার সঙ্গে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং স্পিড বোর্ড নামিয়ে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। তবে পুলিশ প্রশাসন চেষ্টার জন্যই আজ প্রসূতি কে উদ্ধার করতে পেরেছি আমরা।’
এই বিষয়ে স্থানীয় প্রদীপ সরকার বলেন,”এলাকার বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে। এটা আজকের সমস্যা নয় এটা দীর্ঘদিনের। আর সেই জলমগ্ন পরিস্থিতিতে এক প্রসূতি মহিলা আটকা পড়ে যায়। আর তাই পুলিশ প্রশাসন সেইসঙ্গে স্বাস্থ্য দপ্তর অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে নেমে তাকে উদ্ধার করেছে। জলমগ্ন পরিস্থিতি সমাধান অবশ্যই প্রয়োজন। তবে পুলিশ অফিসারের উদ্যোগেই এই আটকা পড়া প্রসূতি কে উদ্ধার করা গেছে।”

এই বিষয়ে এই প্রসূতির মা বলেন,”এখনো বাচ্চা ডেলিভারির সময় হয়নি কিন্তু এই জলমগ্ন পরিস্থিতিতে ও বাপের বাড়িতে আটকা পড়ে যায়। তবে পুলিশ উদ্যোগ নিয়েছে তাকে উদ্ধার করতে। এহেন পুলিশের ভূমিকায় আমাদের তরফ থেকে সাধুবাদ।”
তবে ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে রাজি হননি এই পুলিশ অফিসার। শুধু এইটুকু বলেন এটা আমাদের কর্তব্য।