Rajnarayan House : রাজনারায়ণ বসু এবং ঋষি অরবিন্দের স্মৃতি বিজড়িত ভগ্নপ্রায় বাস ভবন মামলা-মোকদ্দমায় তালাবন্দি! সংরক্ষণ হেরিটেজের দাবি পরিবারের

Share

মেদিনীপুর 29 সে আগস্ট :

নতুন সরকার আসতেই এবার রাজনারায়ণ বসু স্মৃতি বিজড়িত ঘর সংরক্ষণ হেরিটেজ এবং আগামী প্রজন্মের জন্য দরজা খুলে দেওয়ার আবেদন জানালো রাজনারায়ণ বসু এবং ঋষি অরবিন্দের পরিবার। মূলত বিপ্লবী শহর মেদিনীপুরের কোতোয়ালি থানার অন্তর্গত কলিজিয়েট স্কুলের পাশে রয়েছে একটি ভগ্ন আগাছাপূর্ণ বাড়ি। ইতিহাস থেকে। জানা যায় এই ভগ্ন বাড়িতেই ঋষি রাজনারায়ণ বসুর বাসভূমি।

সেইসঙ্গে ঋষি অরবিন্দ ঘোষের মায়ের (স্বর্ণলতা দেবী ও ডা. কৃষ্ণধন ঘোষ)।বিবাহ হয়েছিল এই বাড়িতেই এবং ইতিহাস ঘেঁটে এও জানা যায় যে গুপ্ত সমিতির কাজকর্ম তৎকালীন সময়ে ইংরেজদের তাড়ানোর বিপ্লবীদের যোগাযোগের মাধ্যম এবং মিটিংও হতো এই বাড়িতে। আর তারপরই এসেছে ভারতের স্বাধীনতা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাড়ি এবং স্থান সংরক্ষণের অভাবে বেহাল পড়ে রয়েছে। তার কারণ হিসেবে রয়েছে কলিজিয়েট স্কুল এবং পাশেই মেদিনীপুর কলেজের দ্বৈরথ। কারণ মেদিনীপুর কলেজ দাবি করে তাদের এটা প্রিন্সিপাল কোয়ার্টার যা বিগত দিন ধরে ব্যবহার করে আসছেন প্রিন্সিপালেরা। অন্যদিকে কলেজিয়েট স্কুলের দাবি, রাজনারায়ণ বসুর স্মৃতি বিজড়িত এই ভূমি যা তাদের ব্যবহারের জন্যই করা হয়েছে। যদিও কলেজ আর স্কুলের দ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত জল গড়িয়েছে মামলা-মোকদ্দমায়। আর যার জন্যই আজও অব্দি সিল হয়ে পড়ে রয়েছে এই স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহ্যমন্ডিত ঋষির রাজনারায়ণ এবং অরবিন্দের স্মৃতি ভূমি।

এই বাড়ির ইতিহাস :

১৮৪০-৪১ সালে তৎকালীন মেদিনীপুর স্কুল (পরে জেলা ও কলেজিয়েট স্কুল নামে পরিচিত)-এর নতুন পাকা ভবন ও প্রধান শিক্ষকের বাসভবন তৈরির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান দেওয়া হয়.অবস্থান: এই ঐতিহাসিক আবাসনটি বিদ্যালয় চত্বরের ভেতরেই অবস্থিত ছিল, যেখান থেকে প্রাচীরের ভেতর দিয়েই সরাসরি স্কুলে যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল.রাজনারায়ণ বসুর বসবাস: ১৮৫১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজনারায়ণ বসু এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং এই বাসভবনেই সপরিবারে বসবাস শুরু করেন. ১৮৬১ সালে তাঁর বড় মেয়ে স্বর্ণলতা দেবীর বিয়েও এই আবাস থেকেই হয়েছিল। তাছাড়াও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বৈপ্লবিক কাজকর্ম করার জন্য যে গুপ্ত সমিতি গঠন করা হয়েছিল সেই গুপ্ত সমিতির কাজকর্ম হতো এই বাড়িতে।

রাজনারায়ণ বসুর জীবনী :

রাজনারায়ন বসু ১৮২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চব্বিশ পরগনার বোড়াল গ্রামের বসু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা নন্দকিশোর ছিলেন রাজা রামমোহনের একান্ত অনুগামী। নন্দকিশোর বসু কিছুদিন রাজা রামমোহন রায়ের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজও করেছিলেন। বোড়ালের বসু পরিবারে রাজা রামমোহনের যাতায়াত ও রামমোহন রায়ের স্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করার জন্য রাজনারায়ন বসু কিশোর অবস্থাতেই রামমোহনের আধুনিক চিন্তায় প্রভাবিত হন। কলকাতায় এসে প্রথমে হেয়ার স্কুল ও হিন্দু কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে পড়ার সময় হিন্দু কলেজের মেধাবী ছাত্র হিসেবে উচ্চতর বৃত্তি লাভ করেছিলেন। স্বাজাত্যবোধ ও জাতীয়তাবোধ উদ্রেক করার জন্য নবগোপাল মিত্র কর্তৃক স্থাপিত হিন্দুমেলাতেও তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তরুণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের অন্য ছেলেরাও তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সুবক্তা হিসেবে শ্রোতাদের অনেককেই জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন রাজনারায়ন বসু।

মেদিনীপুর জেলার আর এক গৌরব পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্বাজাত্যাভিমান ও বিধবা বিবাহের উৎসাহী সমর্থক ছিলেন তিনি। অসুস্থতার কারণে রাজনারায়ন বসু প্রধান শিক্ষক পদ থেকে ১৮৬৬ সালে অবসর নিতে বাধ্য হন এবং মেদিনীপুর ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। কিন্তু তাঁর প্রচুর ছাত্র ও সাধারণ জনগণের মধ্যে যে সুশিক্ষা ও স্বাদেশিকতার বীজ বপন করেছিলেন মেদিনীপুর জেলা-সহ সমগ্র বাংলায় তার প্রভাব ছিল অমোঘ। তাঁর জ্ঞান গরিমা, ধর্মপ্রাণতা, উদ্দীপনাময় স্বদেশেপ্রেম আর জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করার নিরলস প্রচেষ্টা তাঁকে ‘ঋষি’ ও “জাতীয়তাবাদের পিতামহ” আখ্যায় আখ্যায়িত করেছিল। শেষ জীবনে তিনি দেওঘরে বাড়ি বানিয়ে সেখানেই বসবাস করাকালীন ১৮৯৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনাবসান হয়। ১৮৪৩ সালে রাজনারায়ণ প্রসন্নময়ী দেবীকে বিবাহ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর, ১৮৪৭ সালে তিনি মেদিনীপুরের অভয়চরণ দত্তের কন্যাকে বিয়ে করেন। শ্রীঅরবিন্দের মাতা স্বর্ণলতা দেবী ছিলেন রাজনারায়ণের জ্যেষ্ঠ কন্যা।

শ্রী অরবিন্দের মা, স্বর্ণলতা দেবী, একজন বিদুষী ও গুণবতী মহিলা ছিলেন। তিনি গল্প ও নাটক লিখতে পারতেন। মেদিনীপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনে মেদিনীপুর শহরে বেলী হল লাইব্রেরি বর্তমান যা ঋষি রাজনারায়ন বসু স্মৃতি পাঠাগার, অলিগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয় যা বর্তমান অলিগঞ্জ ঋষি রাজনারায়ন বসু বালিকা বিদ্যালয় ছাড়াও শ্রমজীবী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বিতর্ক সভা, সাহিত্য উৎসাহিনী সভা, সুরাপান নিবারণী সভা, জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা সহ আরও অনেক সভা সমিতি স্থাপন করে জাতীয় চেতনা সম্প্রসারণে নব জোয়ার আনতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মধুর ও অমায়িক স্বভাবের এবং স্বামীর মতো না হয়ে, ধর্মীয় বিশ্বাসে ছিলেন রক্ষণশীল। তাঁর ব্যক্তিগত আকর্ষণ ও মার্জিত আচরণের জন্য তিনি “রংপুরের গোলাপ” নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তিনি বংশগত রোগ হিস্টিরিয়ার শিকার হন, যা তাঁর নিজের জীবনের পাশাপাশি স্বামীর জীবনকেও বেশ অসুখী করে তুলেছিল।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের জীবনী :

শ্রী অরবিন্দ কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭২ সালে। তাঁর পিতার নাম ছিল কৃষ্ণধন ঘোষ, যিনি হুগলি জেলার কোন্নগর নামক এক ছোট গ্রামের সম্ভ্রান্ত ঘোষ পরিবারের সন্তান ছিলেন। এই গ্রামটি ইতোমধ্যেই ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য নেতাদের জন্ম দিয়েছিল। কৃষ্ণধন স্থানীয় স্কুল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। উনিশ বছর বয়সে, যখন তিনি মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত, তখন তিনি ঋষি রাজনারায়ণ বসুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শ্রীমতী স্বর্ণলতা দেবীকে বিবাহ করেন। শ্রী অরবিন্দ ছিলেন তাঁর পিতার তৃতীয় পুত্র। বিনয় ভূষণ ও মনমোহন ছিলেন তাঁর বড় ভাই। অরবিন্দ শব্দের অর্থ পদ্ম। সেই সময়ে এটি একটি অপ্রচলিত নাম ছিল, এবং সেই কারণেই তাঁর পিতা তাঁর তৃতীয় পুত্রের জন্য এই নামটি বেছে নিয়েছিলেন, সামান্যতম ধারণাও করতে পারেননি যে, গুপ্তবিদ্যায় অরবিন্দ মানে দিব্য চেতনা।


‘শ্রী অরবিন্দ বাড়িতে একটি ইংরেজি পরিবেশে বড় হয়েছিলেন, নিজের মাতৃভাষা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন এবং তাঁর চারপাশে থাকা চাকররা হয় ভাঙা ভাঙা ইংরেজি অথবা হিন্দুস্তানি ভাষায় কথা বলত। পাঁচ বছর বয়সে, তাঁকে তাঁর দুই বড় ভাইয়ের সঙ্গে দার্জিলিং-এর লরেটো কনভেন্ট স্কুলে পাঠানো হয়, যেটি একজন আইরিশ সন্ন্যাসিনী চালাতেন। সেখানে তিন ভাইয়ের বন্ধু ও সঙ্গী হিসেবে কেবল ইউরোপীয় ছেলেরাই ছিল, কারণ স্কুলটি শুধুমাত্র ইউরোপীয় শিশুদের জন্যই তৈরি হয়েছিল।

এই বিষয়ে এই রাজনারায়ণ বসু এবং অরবিন্দ ঘোষের বর্তমান প্রজন্মের সদস্য রাহুল ঘোষের দাবি, “স্মৃতি বিজড়িত এই ঘরের মর্যাদা সরকারকে দিতে হবে। স্কুল ও কলেজের মামলা-মোকদ্দমায় ভগ্ন আগাছাপূর্ণ হয়ে পড়ে রয়েছে এই বাড়ি। যার ফলে বাড়িতে থাকা স্মৃতিগুলি অকালে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের দাবী থাকবে সরকার এবং প্রশাসনের কাছে তারা যেন দুই পক্ষকে বসিয়ে সমাধানের মধ্য দিয়ে এ বাড়ির সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। সেইসঙ্গে একে হেরিটেজ ঘোষণা করে আগামী দিনে যাতে পর্যটনের জন্য খুলে দেওয়া যায় আগামী প্রজন্মের জন্য তার ব্যবস্থা করা।”

এ বিষয়ে আরেক সদস্যা সাগরিকা ঘোষ জানান,”একদিকে যখন রাজনারায়ন বসুর ২০০ তম জন্ম দিবস পালন হচ্ছে নানারকম আয়োজনের মধ্য দিয়ে। তখন অন্যদিকে ভগ্ন বাসভবন পড়ে রয়েছে অবহেলায়। আমার মনে হয় এই শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন তখনই সার্থক হবে যখন তার বাসভবন টি বাসভবন বা হেরিটেজ হয়ে ওঠে। নতুন সরকারের কাছে আবেদন তারা যেন এই বাসভবনটি মুক্ত করে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে এবং সংরক্ষণ করে।”

যদিও এই বিষয়ে মেদিনীপুর কলেজ অধ্যক্ষ অসিত পান্ডা বলেন,”এই বিষয়টা সম্পূর্ণ কোর্টের বিচারাধীন, তাই কোন মন্তব্য করা সম্ভব না। শুধু এইটুকু বলব এই রাজনারায়ণ বসুর বাসভবন দীর্ঘকাল ধরে কলেজ প্রিন্সিপালরা বাস করতেন। তাই প্রিন্সিপাল কোয়ার্টার নামে পরিচিত। আমাদের দাবি থাকবে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক এই বাস ভবন।”

এই বিষয়ে মেদিনীপুর কলেজের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অপর্ণিতা ভট্টাচার্য বলেন,”স্মৃতি বিজড়িত এই রাজনারায়ণ বসু এবং অরবিন্দ ঘোষের বাস ভবন আজকে ভগ্ন এবং আবর্জনাময়। ঋষি রাজনারায়ণ বসু ও ঋষি অরবিন্দ ঘোষের বহু স্মৃতি এই বাড়িতে রয়েছে। তথ্য থেকে এও জানা যায় মেদিনীপুর গুপ্ত সমিতির কাজকর্ম হত এই বাসভবনে। তবে বর্তমানে এই বাসভবন কার দখলে থাকবে সেই বিষয় নিয়ে স্কুল ও কলেজের মামলায় আজ সিল হয়ে পড়ে রয়েছে। তাই সরকার পক্ষের মধ্যস্থতায় স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে এক জায়গায় বসিয়ে এবার ভবনকে খুলে দিতে হবে সঙ্গে হেরিটেজ ঘোষণা করতে হবে এই স্মৃতি বিজড়িত বাসভবনকে। সেই সঙ্গে ১৮০ বছরের আগে রাজনারায়ণ বসু এবং ঋষি অরবিন্দের ব্যবহারযোগ্য জিনিসগুলি সংরক্ষণ করে যদি মিউজিয়াম করা যায় তাহলে ভালো হতো।”


Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *