Chakrabarty Durgapujo : নিরামিষ ও আমিষ ভোগ নিবেদনের মধ্য দিয়ে 200 বছরের চক্রবর্তী জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো! প্রাচীন নিয়ম রীতি মেনে আজও পূজো হয় 6 ফুটের পটচিত্রে

Share

মেদিনীপুর 2 রা অক্টোবর :

পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা জুড়ে আনাচে কানাচে রয়েছে বিপ্লবীদের পদচিহ্ন আর এই বিপ্লবীদের পদ চিহ্নিত পাশাপাশি বহু জমিদার বাড়ির পুজো আজও অমলিন। হয়তো সেই আগেকারের আভিজাত্য ঢাকঢোল হাতি ঘোড়া আজ আর নেই তবে পূজোর রীতিনীতি এখনো বজায় রেখেছে বর্তমান প্রজন্ম। এরকমই এক জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো হলো বিরাট রাজার চক্রবর্তী পরিবারের।

পরিবারের তথ্য দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায় এই পুজোর সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় ২০০ বছর আগে। তৎকালীন সময়ে বিরাট রাজার রাজ পুরোহিত রাখাল চক্রবর্তীর এই পুজো শুরু করেন। তবে অন্যান্য দূর্গা পুজো থেকে এ পর্যন্ত একটু আলাদা কারণ এখানে মূর্তি পূজো হয় না পুজো হয় পথ পটের দুর্গা ঠাকুরের। সব ফুট বাই চার ফুটের একটি পথ চিহ্নে দূর্গা আঁকা হয় এবং সেই দুর্গাকে নিয়েই পাঁচ দিন ধরে পুজো হয় এবং বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় বিসর্জন হয়।

পুজোর বিশেষত্ব :

এই পুজোর বৈশিষ্ট্য হল প্রথম কয়েকদিন ফলমূল নৈবেদ্য সহকারে নিরামিষ দিয়ে দেবীকে তুষ্ট করা। এরপর শেষের দিকে আমিষ ব্যঞ্জনে দেবীকে ভোগ নিবেদন। আর পাঁচটা জায়গার মতোই এখানকার পুজো শুরু হয় ষষ্ঠীতে। প্রসাদে ল্যাটা মাছ পোড়া ৷ওই দিন পুজোর প্রধান নৈবেদ্য হল ভাত, রুই মাছের ঝোল-সহ পঞ্চব্যঞ্জন ৷ যদিও আমিষের ভোগ খাইয়াই দেবীকে পাঠানো হয় কৈলাসে শিবের কাছে।

পরিবার সূত্র অনুযায়ী এই পুজো যেভাবে আয়োজন করা হয় তা অন্যান্য পূজো থেকে একটু আলাদা।মেদিনীপুর শহরে এই মিঞা বাজারের বিরাট রাজার রাজপুরোহিত রাখাল চক্রবর্তীর বাড়ির পুজো ৷ আর এই পুজো শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় 200 বছরের বেশি সময় আগে ৷ জমিদারি আমলের এই পুজোয় প্রতিমা গড়ার অনুমতি ছিল না ৷ তাই পাঁচ ফুট বাই পাঁচ ফুটের পটচিত্রে প্রথম পুজো শুরু করেন রাখাল চক্রবর্তী ৷ তিনি নিজেই ছিলেন প্রধান পুরোহিত ৷ ষষ্ঠী থেকে পুজো শুরু হয়। এর পর সপ্তমীর ভোরে সাতটি কুয়োর জল দিয়ে অভিষেক করিয়ে মন্দিরে ঢোকানো হয় মাকে। এরপর সপ্তমী অষ্টমী নবমীর পুজো হয় উৎসাহ উদ্দীপনায়। এক সময় বলি প্রথা ছিল এই জমিদার বাড়ির সেই সঙ্গে হাতি ঘোড়া নিয়ে এসে পুজোর সূত্রপাত হতো কিন্তু কালের গর্ভে সেসব হারিয়ে গিয়েছে।

বর্তমানে সন্তানের মঙ্গল কামনায় বলির প্রচলন থাকলেও চক্রবর্তী বাড়ির পুজোয় ছাগল বা অন্য কোনও পশুর বলি দেওয়া হয় না ৷ এখন পশু বলির পরিবর্তে চালকুমড়ো বলি দিয়ে নিয়মরক্ষা করা হয় ৷ এই বাড়ির মহা যজ্ঞ দেখতে ভিড় জমান আশেপাশের মানুষ। সপ্তমী থেকে নবমী টানা তিনদিন ধরে চলে মহাযজ্ঞ ৷ অষ্টমীতে 108টি নীলপদ্ম অর্পণ করে দেবীর পুজো হয় ৷ নবমীর দিন দেবীকে নিরামিষ অন্নের ভোগ দেওয়া হয় ৷ তবে, দশমীতে ফল দেওয়া হয় দেবী দুর্গাকে ৷ ওই দিন দুর্গাকে নৈবেদ্য হিসাবে ঝিঙ্গে, ল্যাটা মাছ ও শোল মাছ পোড়া অর্পণ করা হয় ৷ যদিও, প্রথা মেনে পটের দুর্গার বিসর্জন হয় দশমীতেই ৷ রাখাল চক্রবর্তীর আমলে মহা ধুমধাম করে বিসর্জন করা হত চক্রবর্তী বাড়ির ঠাকুর ৷ বাড়ির ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় শতাধিক সদস্য এ পুজোর কটা দিন ফিরে আসেন বাড়িতে। এই কয়েকদিন জাঁকজমকভাবে পুজোর সঙ্গে চলে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা এবং একে অপরের কুশল বিনিময়। যদিও সব শেষে পরিবারের সদস্যদের কাঁধে রেখেই মা বিসর্জন হয় কাঁসাই নদীতে।

অন্যদিকে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য নন্দন চক্রবর্তী বলেন,” আমরা রাখাল চক্রবর্তীকে জানি চিনি তার বংশধর কিন্তু তার আগে থেকেও এ পুজো হয়ে আসছে। আমাদের এই শোল মাছ প্রসাদ দেওয়ার কারণ যখন মা কৈলাসে ভগবান শিবের কাছে যাবে তখন জিজ্ঞেস করবে যে বাপের বাড়ি থেকে কি খেয়ে এলেন। তখন মা বলবেন আমার বাপের বাড়ি গরীব মানুষ, তাই মাছ ভাত এবং পান্তা ভাত খাইয়ে পাঠিয়েছে। মূলত ষষ্ঠীতে মায়ের আগমন ঘটে সপ্তমীতে ঘট ডোবানো হয়। এরপর কয়েকদিন চলে পূজো এবারে এক্সট্রা করে একটি দিন পড়েছে তাই সেই দিনও আমাদের পুজো হবে। এই পুজোতে সমস্ত শরিকরা ছুটে আসে এই পুজো দেখতে,উৎসবে যোগ দিতে এবং কয়েক দিন ধরেই চলে অনুষ্ঠান পর্ব। যদিও কয়েকদিন আমিষ ও নিরামিষ ভোজনের পর মাকে আমতলা ঘাটের কাঁসাই নদীতেই বিসর্জন দেওয়া হয় রীতি রেওয়াজ মেনে ঢাক ঢোল সহকারে।”

এই বিষয়ে বাড়ির সদস্য নবেন্দু চক্রবর্তী বলেন,”রাখাল চক্রবর্তীর হাত ধরে এই পূজোর সূত্রপাত হয়। এটা শুনেছি। যদিও মাকে বরণ করা হয়, আমিষ ভোজনের মধ্য দিয়ে। এরপর সপ্তমীতে ঘট উত্তোলনের সময় ঢাকঢোল হাতি সহকারে উত্তোলন করা হয়। তারপর চার দিনব্যাপী চলে পুজো, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেইসঙ্গে পটে দুর্গা ঠাকুর এর সন্ধিপুজো হয় শেষে। যেহেতু আমাদের আগে থেকে সিংহবাহিনী মা দুর্গা রয়েছে তাই প্রথম থেকেই পটের দুর্গা পুজো হয়ে আসছে। নবমীর শেষে মাকে মাছের পোড়া এবং ঝোল খাইয়ে কৈলাসের পথে পাঠানো হবে।”

তবে সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী বলেন,” শুনেছি হাতি নিয়ে এসে মায়ের ঘট উত্তোলন করতে যাওয়া হত কিন্তু আস্তে আস্তে সেগুলো লোক পেয়েছে এখন হাতি ঘোড়া দিয়ে হয় না বরং বাদ্যযন্ত্র সহকারে মায়ের ঘট উত্তোলন করা হয়। আমাদের দুর্গা মা পটের ছবিতে পূজা হয়। কারণ আমাদের সিংহ বাহিনী দূর্গা মা আগে থেকে রয়েছে বাড়িতে। তাই এই পটের ছবিতে আমাদের পূজো হয় পরম্পরা মেনে।”


Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *