Midnapore Hastings House : অবশেষে ওয়ারেন হেস্টিংস এর নাম মুছতে চলেছে বিপ্লবী শহর মেদিনীপুরে! নতুন নাম ‘শহীদ ক্ষুদিরাম’ বোস ভবন

Share

মেদিনীপুর 6 ই আগস্ট :

অবশেষে কলঙ্ক মুছতে চলেছে মেদিনীপুর জেলার। হেস্টিংস হাউসের পরিবর্তে ক্ষুদিরাম ভবনের নামকরণের প্রস্তাব। আর তাতেই সাড়া মিলেছে মেদিনীপুর বাসীর। যদিও জেলাশাসকের বক্তব্য হেরিটেজ বিল্ডিং রয়েছে তাও আমরা বিষয়টা খতিয়ে দেখছি। অন্যদিকে ইতিহাস বিদ গবেষকের বক্তব্য পুরো বাংলোর নাম সরিয়ে দিয়ে নয় বরং একটি ছোট তালিকা করে টাঙিয়ে রাখা যেতে পারে যাতে আগামী প্রজন্ম দেখে বুঝতে পারে তার ইতিহাস।

একে একে কেটেছে ৭৯ তম দিবস এবারে ৮০ তম স্বাধীনতা দিবস সাড়ম্বরে পালন হবে দেশ জুড়ে। তবে এখন জ্বল জ্বল করছে বিপ্লবী শহর মেদিনীপুরে ইংরেজ দের নিদর্শন। আজও ‘হেস্টিংস হাউস’ নিয়ে দিন কাটছে বিভক্ত পশ্চিম মেদিনীপুর বাসীর। তবে রাজ্যে পালা বদলের পর এই হেস্টিংস হাউসের নাম বদলের দাবি তুললেন মেদিনীপুরের বিজেপি বিধায়ক শংকর কুমার গুছাইত। জেলার জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণ কে দিলেন সেই দাবি পত্র। তাতে উল্লেখ করলেন, এই হাউসের নাম বদলে রাখা হোক ‘শহীদ ক্ষুদিরাম বসু ভবন’। তিনি তাতে এও বলেন,’অত্যাচারী ঔপনিবেশিক শাসনের স্মৃতি বহনকারী একটি নাম আজও আমাদের ঐতিহাসিক মেদিনীপুরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা শাসকের বাংলোর নাম এখনও ‘হেস্টিংস হাউস’ স্বাধীনতার এত বছর পরও এমন একটি নাম আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং বিপ্লবী চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

জেলা শাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছি যে, এই বাংলোর নাম পরিবর্তন করে আমাদের গর্ব, ভারতের অমর বীর বিপ্লবী শহীদ ক্ষুদিরাম বসু-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে’শহীদ ক্ষুদিরাম বসু ভবন’ রাখা হোক। কেননা মেদিনীপুরের মাটি বীরের মাটি। এই মাটিই জন্ম দিয়েছে ক্ষুদিরাম বসুর মতো অমর বিপ্লবীকে। তাই আমাদের ঐতিহ্য, আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় চেতনার প্রতি সম্মান জানিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের স্মারক নামের পরিবর্তে আমাদের বীর সন্তানদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ হওয়াই সময়ের দাবি করি।যদিও এই হেস্টিং হাউসের নামকরণের কারণ হিসেবে ইতিহাসবিদদের কাছ থেকে জানা যায়,ওয়ারেন হেস্টিংস ভারতের গর্ভনর জেনারেল হিসাবে ১৭৭৪ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব সামলেছিলেন । তিনি থাকাকালীন মেদিনীপুরে তৈরি হয় একটি প্রশাসনিক ভবন যাকে জেলা কালেক্টরেট বলা হয়। এছাড়াও তিনি যে বাংলোই থাকতেন সেই বাংলোর নাম নাম হয় হেস্টিংস হাউস ।

সেই থেকেই বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যালয় চলে আসছে এই ভবনে ৷ বর্তমানে সেখানে পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসকের বাংলো ৷ বহু জেলাশাসক স্বাধীনতার পর এই বাংলোতেই দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু কোন জেলাশাসকই এই নাম পরিবর্তনে বিশেষ উদ্যোগী হননি। একে একে কেটে গিয়েছে স্বাধীনতার ৭৯ টা বছর। তবুও স্মৃতিচিহ্ন রয়ে গিয়েছে ইংরেজদের এই বাংলার বুকে। যদিও এই বাংলার বহু বিপ্লবী মূর্তি, স্ট্যাচু ছবি স্মৃতি চিহ্ন এখনো জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন যৌবন যেমন দিয়েছেন তেমনি কম বয়সে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন আনন্দে। এরকম একাধিক বিপ্লবী ও তার পরিবার এখনও রয়ে গেছে মেদিনীপুরে। বিশেষ করে অল্প বয়েসে প্রাণ দেওয়া ক্ষুদিরাম বসু, প্রকাশ্যে কুখ্যাত ইংরেজ জেলাশাসক কে হত্যাকারী অনাথবন্ধু পাঁজা, দীনেশ গুপ্ত, মৃগেন দত্ত, বিমল দাস গুপ্ত, নির্মল জীবন ঘোষের মতো বিপ্লবী প্রাণ দিয়েছেন এই মাটিতেই ৷

এমনকি পরপর তিন বছর কুখ্যাত ইংরেজ জেলাশাসককে হত্যা করে ব্রিটিশদের বুকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল এই অবিভক্ত মেদিনীপুরের বিপ্লবীরা। একদিকে যেমন ব্রিটিশদের হত্যা করেছিল তেমনি ভারতীয় স্বাধীনতার জন্য বাকি বিপ্লবীরা যাতে ধরা না পড়ে তার আগেই ফাঁসির দড়িতে মৃত্যুবরণ, বিষ খেয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল এই দেশপ্রেমিক বিপ্লবীরা। যদিও অনেকে বলেন এমন বহু বিপ্লবী নিখোঁজ রয়েছেন বা ইতিহাসের পাতায় আসেননি যারা এই বাংলা এবং মেদিনীপুর থেকে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। তাদের পরিবাররা আজও অবহেলা অনাদারের দিন কাটাচ্ছেন, দিন কাটাচ্ছেন সেইসব বিপ্লবীদের ফিরে আসার অপেক্ষায়।

এ বিষয়ে মেদিনীপুরের বিধায়ক শংকর কুমার গুছাইত বলেন,” মেদিনীপুর জেলা ও সহ পুরোটাই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। কিন্তু সাথে ইংরেজদের গর্ভনরের নাম হিসেবে এখনো হেস্টিংস হাউসের নাম জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু যারা জীবন দিল এই স্বাধীনতা আনতে গিয়ে তারা কোনোভাবেই সম্মান পাচ্ছে না। তাই মেদিনীপুরে বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ভবন নামকরণ যাতে হয় তার জন্য দাবি পত্র দিয়েছি।

অন্যদিকে জেলার জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণ বলেন,”প্রস্তাব পেয়েছি কিন্তু আমরা খতিয়ে দেখছি যেহেতু এটা হেরিটেজ বিল্ডিং। সেই সঙ্গে এর নাম কোথা থেকে কিভাবে দেওয়া হয়েছিল কিভাবে পরিবর্তন করা যায় তা আমরা খতিয়ে দেখছি।

এ বিষয়ে ইতিহাসবিদ, অধ্যাপক অপর্নিতা ভট্টাচার্য বলেন,” হেস্টিং ছিলেন তৎকালীন সময়ে গর্ভনর। তিনি তার রাজ্য পরিচালনা করার জন্যই এই খানে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। বাংলো ব্যবহার করতেন তিনি। পরবর্তীকালে তাই তার বাংলোর নাম রাখা হয়েছিল হয়তো হেস্টিংস হাউস। পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর বিপ্লবীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নিজেদের জীবন দিয়ে দেশকে স্বাধীন করার জন্য। সেক্ষেত্রেই কুখ্যাত ইংরেজদের বাংলোর নাম অবশ্যই পরিবর্তন হওয়ার দরকার। তবে তার পাশাপাশি এও দাবি থাকতে পারে কোথাও একটা বোর্ডের মাধ্যমে সিরিয়াল নাম রাখা হোক সেই হেস্টিংয়ের।

এ বিষয়ে মেদিনীপুরের স্থানীয় অনয় মাইতি বলেন,”স্বাধীনতা এত বছর হওয়ার পরও কেনই বা ইংরেজদের নামে বাংলো থাকবে তা আমাদের প্রশ্ন বহু কালের। এক্ষেত্রে আমাদের বিধায়ক যে নাম পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেছে তার আমরা পুনঃসমর্থন জানায়। অবিলম্বে সেই নাম পরিবর্তন করা দরকার এই বাংলোর। আরেকজন মেদিনীপুর বাসী অপরূপ বক্সী বলেন,’ইংরেজরা চলে গেলেও তাদের নাম এখনো বহন করে চলছে আমাদের জেলার জেলা শাসকরা। এই নাম অনেক আগেই পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল। আমরা নাম পরিবর্তনের স্বপক্ষে। এক্ষেত্রে মাননীয় বিধায়ক যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা আমাদের সমর্থন রইল মেদিনীপুর বাসী হিসেবে।”


Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *