
পাথরা 26 সে সেপ্টেম্বর :
পাথরা! মেদিনীপুর শহর থেকে ১৫ থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থান। এলাকায় বসবাস করেন হিন্দু-মুসলিমস আদিবাসী সহ অনগ্রসর জনজাতির মানুষজন। এতদূর থেকে তাঁরা পায়ে হেঁটে মেদিনীপুর শহরে পুজো দেখতে যেতে পারেন না। তাই এলাকার মানুষ একজোট হয়ে ভেবেছিলেন, তাঁরাই দুর্গাপুজো শুরু করবেন। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। পুরোনো, বন্ধ হয়ে যাওয়া জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো আবারও চালু করেন তাঁরা। যা পাথরা পঞ্চগ্রাম সর্বজনীন দুর্গোৎসব নামে বর্তমানে পরিচিত। এ’বছর সেই পুজো ৩২ বছরে পা দিচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই এলাকায় একাধিক হিন্দু দেবদেবীর মন্দির রয়েছে। সেসবের মধ্যে রয়েছে দুর্গামন্দিরও। কোনও এক জমিদার এই দুর্গামন্দিরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আড়ম্বর ও জাঁকজমকের সঙ্গে দুর্গাপুজোর পত্তন করেন৷ পুজোয় ছিল বলিপ্রথাও। কখনও নাকি এই দুর্গাপুজোয় ১০০ মহিষ বলি হত। বলির রক্তে ভেসে যেত মন্দির চত্বর। মন্দির চত্বর থেকে একটি নালা চলে যেত সোজা কংসাবতী নদীতে। সেই নালা দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া রক্তে কংসাবতীর জল লাল হয়ে যেত। পুজো দেখতে হাজির হতেন আশেপাশের গ্রামের মানুষজন।আসতেন অন্যান্য জমিদাররাও। হাতি-ঘোড়া সহযোগে কামান দেগে হত পুজো। কিন্তু কালের গর্ভে সবই হারিয়েছে,আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত এই দুর্গামন্দির। এই দুর্গামন্দিরে দীর্ঘদিন ধরে পুজো করে আসছেন পাথরা গ্রামের মানুষজন। আগের মতো আড়ম্বর হয়তো এখন আর নেই। তবে প্রাচীন রীতি মেনে এখানে মায়ের পুজো হয়। পশুবলি প্রথা এখন বন্ধ।

তবে ফল বলি চালু রয়েছে। মন্দিরের দায়িত্ব এখন আর্কিওলজিক্যাল অফ ইন্ডিয়ার হাতে। কেন্দ্রীয় এই সংস্থা এই মন্দিরে দুর্গাপুজোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। অগত্যা গ্রামবাসীরা গ্রামের মধ্যে একটি ফাঁকা মাঠে নিজেদের দুর্গাপুজো সরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তাছাড়া এই মন্দিরে পুজো করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত প্রশ্নও ছিল।ঘন জঙ্গল পেরিয়ে মন্দিরে আসতে হত৷এই পুজো কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়৷ এলাকার হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী জনজাতির মানুষজন একসঙ্গে এই পুজো করেন। একসঙ্গে চাঁদা তোলেন, বাঁশের মণ্ডপে হাত লাগান, ঠাকুরও গড়েন একসঙ্গে। মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পুজোর ক’টা দিন তাঁরা একসঙ্গেই আনন্দে মেতে উঠবেন। ঢাকের তালে কোমরও দোলাবেন একসঙ্গে। এখন রাজনীতির পালাবদল বা পট পরিবর্তন হয়েছে রাজ্যে। তবে এই পুজো রয়ে গিয়েছে গ্রামবাসীদের হাতেই। এখনও রফিক, চন্দ্রশেখর, স্বপনরা একসঙ্গেই পুজোর যাবতীয় ব্যবস্থা করেন।

পাথরা পঞ্চগ্রাম সর্বজনীন দুর্গোৎসব ক্লাব সভাপতি চন্দ্রশেখর শেখর ভট্টাচার্য বলেন, “ধীরে ধীরে এই পুজো ৩১ পেরিয়ে ৩২ বছরে পদার্পণ করতে চলেছে। এই পুজো সমস্ত গ্রামবাসীর। এলাকার পাঁচটি গ্রামের মানুষজন এই পুজোয় অংশগ্রহণ করেন। কোনও একসময় জমিদারবাড়ির পুজো হতো এখানকার দুর্গামন্দিরে। ওই পুজোয় ১০০ মহিষ বলি দেওয়া হত বলে জানা যায়। বলির রক্ত এই খাল দিয়ে কাঁসাই নদীতে বয়ে যেত। তবে আজ আর সেই জমিদার নেই, বলিপ্রথা নেই, সেই বর্ণাঢ্য আয়োজনও নেই কিন্তু পুজোটা রয়ে গিয়েছে। আমরাই তার আয়োজন করে আসছি। মেদিনীপুরে শহরে গ্রামের লোকেরা খালি পায়ে পুজো দেখতে যেতে পারত না। তাদের দুঃখ দুর্দশা ঘোচাতেই এই পুজোর সূত্রপাত। তবে বেশ কিছু কারণে পুজো এখন আর মন্দিরে হয় না। গ্রামের ভিতরে সরে এসেছে পুজো। কিন্তু পুজো ঘিরে গ্রামের সবার উৎসাহ আর উদ্দীপনা আগের মতোই রয়ে গিয়েছে। ”

পুজো উদ্যোক্তা রফিক খান বলছেন, “আমরা সবাই একসঙ্গে দীর্ঘ বছর ধরে গ্রামে এই পুজো করে আসছি। আমাদের এখানে জাতি কিংবা সমাজ নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। চাঁদা তোলা থেকে পুজোর আয়োজন, সেই সঙ্গে এই ক’টা দিন সব অনুষ্ঠানের আয়োজন আমারাই করে থাকি। আমাদের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই। গ্রামের পুজো, তাই আনন্দ সবার।”

আরেক পুজো উদ্যোক্তা স্বপন বাগ জানাচ্ছেন, “এই পুজো গ্রামের প্রতিটি মানুষের। গরিব গ্রাম। তাই যে যেমন পারেন, টাকা দিয়ে পুজোয় সাহায্য করেন। সবার টাকাতেই মায়ের পুজো হয়। এই ক’দিন উৎসবের আনন্দে মেতে উঠে আট থেকে আশির। যে কোনও ধর্মের মানুষ মায়ের পুজোয় অংশ নিতে পারেন। ”