
বাড়ুয়া, 19 সে অগস্ট :
এ আর রহমান! বিশ্বখ্যাত মিউজিক কম্পোজার৷ একাই অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারেন৷ তাঁর সুরের মূর্ছনায় ভেসে যেতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে হয় শ্রোতা ও দর্শকদের৷ একই পরিস্থিতি ছিল বাপি লাহিড়ীর ক্ষেত্রেও৷ তিনিও একাধিক বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী ছিলেন৷ রহমান কিংবা বাপির নাম তো সবাই জানেন৷ কিন্তু রঞ্জনের নাম ক’জন শুনেছেন! এই রঞ্জনও কিন্তু সুরের যাদুকর৷ একসঙ্গে ৩১টি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী তিনি৷

মূলত তাঁর বাঁশির সুর দেশ ছাড়িয়ে পাড়ি দিয়েছে বিদেশের বাতাসেও৷ মার্কিন মুলুক থেকে শুরু করে ইউরোপ, বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠানও করেছেন তিনি৷ তাঁর সুরের মায়ায় মুগ্ধ শ্রোতাদের তালিকায় রয়েছেন উস্তাদ আমজাদ আলি খান, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শংকরদয়াল শর্মা, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এমন একজন শিল্পীর আক্ষেপ, তাঁর সমস্ত বাদ্যযন্ত্রগুলি সাজিয়ে রাখার মতো সঠিক ঘরই পাওয়া গেল না৷ তৈরি হল না একটা মিউজিয়াম৷ পুরো নাম রঞ্জন জানা৷ বাড়ি মেদিনীপুর শহরের কোতোয়ালী থানার অন্তর্গত বাড়ুয়া এলাকায়৷ ছোট থেকে বাদ্যযন্ত্রের প্রতি অসম্ভব ঝোঁক ছিল তাঁর৷ কারও কাছে কোনওদিন তালিম নেননি৷ কোন এক মেলায় গিয়ে বাঁশি নিয়ে প্রথম চেষ্টা। তারপর কঠোর সাধনা। এভাবেই একে একে ৩১টি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন তিনি৷ আজ তিনি গোটা বিশ্বকে মুগ্ধ করছেন তাঁর বাঁশির সুরের মূর্ছনায়। রঞ্জনবাবুর কথায়, “এক মেলায় বাঁশি কিনে বাজানো শুরু করি। পরে এলাকার যাত্রাপালা, নাটকে অংশগ্রহণ করি৷

সেখানে একাধিক বাদ্যযন্ত্রী নিজেদের যন্ত্র বাজাতেন৷ তাঁদের ফলো করতে শুরু করি৷ এদিকে মেলাক কেনা বাঁশিটা নিয়ে মাঠে গরু চরাতে যেতাম৷ সেই বাঁশির সুরে মুগ্ধ হত শ্রোতা পশুরা। এরপর বিভিন্ন যাত্রাপালা এবং নাটকে অংশগ্রহণ করে ধীরে ধীরে মানুষের নজরে এসেছি। পরবর্তীতে কিংবদন্তি নায়ক রবি ঘোষের সঙ্গে সিনেমায় বাঁশি বাজানোর সুযোগ পাই। এরপর একে একে ঢাক, ঢোল, সেতার, রকমারি বাঁশি সহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শুরু করি৷”তাঁর বাঁশির সুরই রঞ্জনবাবুকে মেদিনীপুর থেকে টেনে নিয়ে গিয়েছে দেশের বিভিন্ন জায়গার পাশাপাশি বিদেশেও৷ অসংখ্য শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে তাঁর বাঁশির আওয়াজ শুনেছেন৷ তারিফ করেছেন তাঁর বাদ্যযন্ত্র বাজানোর পারদর্শিতার৷ একসময় মুম্বই-এর একটি কনসার্টে বিখ্যাত ভারতীয় প্লেব্যাক গায়ক, সুরকার ও অভিনেতা এসপি বালাসুব্রহ্মণ্যম তার বাঁশি শুনে মুগ্ধ হন৷ তাঁকে বাহবাও দেন। গুজরাটের একটি কনসার্টে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও গুজরাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বাঁশির সুরে মোহিত হয়ে যান৷

তাঁর বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়েছেন উস্তাদ আমজাদ আলি খান, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শংকরদয়াল শর্মা, বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে সরকারি চাকরির অফারও দেন। কিন্তু পেটে বিদ্যা না থাকায় সেই চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি রঞ্জনবাবু। পরবর্তীকালে শালবনিতে তাঁকে একটি চাকরি দেওয়া হয়। সেই চাকরি ছিল, ওই এলাকার বাচ্চাদের বাঁশির সুরের ট্রেনিং দেওয়া৷ কিন্তু ছাব্বিশের ভোটের সময় প্রচারে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ এক অনুষ্ঠানে এলে চলমান মিছিল থেকে রঞ্জনবাবুর গলায় একটি মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলস্বরূপ বিদায়ি রাজ্য সরকার ওসিএল কোম্পানির কাজ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেয়৷ তাতেই অনেকটা আক্ষেপ রয়েছে এই শিল্পীর মনে। তবে সরকারের রাজনীতি যাই হোক, রঞ্জনবাবু এগিয়ে চলেন মানবিকতার রাস্তা ধরে৷ বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে পাওয়া টাকা তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন এলাকার মানুষের উন্নয়নকল্পে। কখনো কারও দুরারোগ্য রোগীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি৷

টাকার অভাবে কারও মেয়ের বিয়ে আটকে গেলে মুশকিল আসান তিনি৷ গরিব ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্যও তিনি অর্থসাহায্য করে যান৷ শুধু একটিই আক্ষেপ রয়ে গিয়েছে তাঁর৷ সেটি হল মিউজিয়াম৷ তিনি জানাচ্ছেন, তাঁর ঘর অত্যন্ত ছোট৷ সেখানে এত বাদ্যযন্ত্র সাজিয়ে রাখা কিংবা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না৷ ফলে ধীরে ধীরে মরচে পড়তে শুরু করেছে সেসব৷ এটা শুধু যন্ত্রের উপর জং ধরা নয়, তাঁর শিল্পসত্তার উপরেই একটা আঘাত৷ তবে এখনও দেশ কিংবা বিদেশ থেকে ডাক পেলেই অনুষ্ঠান করতে ছুটে যান তিনি৷ এই বিষয়ে শিল্পী রঞ্জন জানা বলেন,” ছোটবেলা থেকে তালিম সেভাবে পাইনি, বিভিন্ন যাত্রাপালায় সেইসঙ্গে বিভিন্ন জনের বাঁশি বাজানো দেখেই এই সুর রপ্ত করা। বহু সাধনার পর দেশ-বিদেশ বহু জায়গায় ডাক পেয়েছি, আমার বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়েছেন বহু বিশিষ্ট জনেরা। খুশি হয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী। যদিও মুখ্যমন্ত্রীর তরফে একটা চাকরি জুটে ছিল কিন্তু কোথাও একটা রাজনীতির কারণে তা থেকে বঞ্চিত আমি।

শুধু টাকা অর্জন করেছে তা নয়,এলাকার বহু দুরারোগ্য মানুষের যেমন পাশে থেকেছি, সেই সঙ্গে বহু গরীব পরিবারের মেয়েদের বিবাহের ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব সাহায্য করেছি।আমার এই শেষ বয়সে,শেষ ইচ্ছে আমার এই ৩১টি ইনস্ট্রুমেন্ট সাজিয়ে রাখার জন্য একটা মিউজিয়াম করে দেওয়া হোক।